নভেম্বর ২৯, ২০২২ ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ || ইউএসবাংলানিউজ২৪.কম

ইউএস বাংলানিউজ, নিউইয়র্ক

অগ্রসর পাঠকের বাংলা অনলাইন

‘যেকোনো অবস্থার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে’

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা দেশের মানুষকে ভালো রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে দেশের মানুষ যেন ভালো থাকে, সুস্থ থাকে। যেখানে উন্নত দেশ হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে আমাদের তো ভুগতেই হবে। যেকোনো অবস্থার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

রোববার (৬ অক্টোবর) রাতে জাতীয় সংসদের ২০তম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। সরকারপ্রধান তার বক্তব্যে দেশের আমদানি-রপ্তানি পরিস্থিতি, রিজার্ভ, বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতিসহ সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ তুলে ধরেন।

ডলারের ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমাদের ওপর একটা চাপ আছে। অবশ্য ঋণপত্র খোলার জন্য যে বাড়তি চাপ, তা ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করছি। জানুয়ারি ২৩ থেকে যাতে ডলারের চাপ কেটে যায়, সেদিকে দৃষ্টি দিয়েছি।

দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতির বিশদ বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, রিজার্ভ নিয়ে সবাই আলোচনা করে। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন রিজার্ভ পেয়েছিলাম ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমরা ক্ষমতায় এসে কিছুটা বাড়িয়েছিলাম, প্রায় ৪ বিলিয়নের কাছাকাছি। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতায় এসে রিজার্ভ পাই ৫ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তখন কিন্তু রিজার্ভ নিয়ে এত আলোচনা হয়নি। ৮ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে রিজার্ভ ছিল ১৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। চতুর্থ দফায় ক্ষমতা নেওয়ার সময় ৭ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার।

তিনি বলেন, ৩০ জুন ২০২০ রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ৩০ জুন ২০২১ তারিখে ছিল ৪৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। ৩০ জুন ২২ তারিখে ছিল ৪১ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমরা প্রায় ৪৮ বিলিয়নের কাছাকাছি গিয়েছিলাম। করোনা কমে যাওয়ার পর সব কিছু উন্মুক্ত হওয়ায় আমাদের আমদানি বাড়তে থাকল। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের রিজার্ভ কমতে থাকল। ৩ নভেম্বর ২০২২ তারিখে রিজার্ভ ছিল ৩৫ দশমিক ৭২ বিলিয়ন। আমাদের যে রিজার্ভ আছে, তা দিয়ে অন্তত পাঁচ মাসের আমদানি করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তিন মাসের আমদানি করার মতো রিজার্ভ থাকলেই যথেষ্ট।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, রিজার্ভ গেল কোথায়? শুধু বললে তো হবে না। আমরা বিনা পয়সায় করোনার ভ্যাকসিন দিয়েছি। এই ভ্যাকসিন কিন্তু ডলার দিয়ে কিনতে হয়েছে। সিরিঞ্জ কিনতে হয়েছে। করোনাকালে চিকিৎসাকর্মীদের আলাদা ভাতা দিয়েছি।

সরকার সার্বিক বিষয়ে সতর্ক রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থমন্ত্রী থেকে শুরু করে সবার সঙ্গে বসেছি। হ্যাঁ, সামনে কী হতে যাচ্ছে সেটা একটা আশঙ্কার বিষয়। এখন থেকে প্রতিনিয়ত এই বিষয়টি পর্যালোচনা করা, ভবিষ্যতে আমাদের কী করণীয়, সেই সিদ্ধান্ত আমাদের নিতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমাদের বিলাস দ্রব্যের আমদানি কমাতে হবে। বা এর ওপর আমাদের ট্যাক্সও বসাতে হবে বেশি করে।

দেশবাসীকে উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা বলেন, দামি গাড়ি না চালালে…। আমাদের আঙুর-আপেল না খেলে কী হয়? এখন তো আমাদের দেশীয় ফল প্রচুর আছে। আমাদের তরমুজসহ কত কিছু আছে। নিজেদের তো আছে। সবাইকে বলব এই বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে।

সরকারের ঋণ পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক নয়— এমনটি জানিয়ে সংসদ নেতা বলেন, সরকারি ঋণ জিডিপির মাত্র ৩৬ শতাংশ। বৈদেশিক ঋণ ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আমরা কোনোদিনই ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হইনি। আমরা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করে যাই। আমরা কখনো ডিফল্টার হইনি। ভবিষ্যতেও ইনশাল্লাহ হব না।

অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা অর্থনীতিটা ধরে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। সবাইকে বলব, প্রত্যেককে কিছুটা কৃচ্ছ্রতা সাধন করতে হবে। অর্থ সাশ্রয় করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া বিদ্যুতের সুইচ বন্ধ রাখতে হবে। মোবাইল, টিভি, টেলিফোন.. যা কিছু। আসলে লাল বাতিটা যদি জ্বলা থাকে, বিল ওঠে। প্রতিটি পরিবার যাতে এ বিষয়ে সচেতন হয়। এই সুইচগুলো বন্ধ রাখতে বিলটা কম উঠবে। ইংল্যান্ডে এটি কড়াকড়িভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুতের বিল বাড়লে কিন্তু ফাইনও করে তারা। তারা ৮০ শতাংশ বিদ্যুতের বিল বাড়িয়েছে। সেখানে রেশন করা হয়েছে। ইউরোপ এই শীতের সময় প্ল্যান করছে কীভাবে তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা তো দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। এক কোটি মানুষকে কার্ড দিয়েছি। তাদের ৩০ টাকা কেজিতে চাল দিয়ে যাচ্ছি। তেল, চিনি ও ডাল কম মূল্যে সরবরাহ করে যাচ্ছি।

দেশবাসীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, খাদ্য উৎপাদনটা বাড়ানো, আমদানি করা জিনিসের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো-সেই জিনিসটা আমাদের করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানি বাড়ানো- কোন দেশে কী পণ্য রপ্তানি করা যায়, তার জন্য আমরা চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। কিন্তু এজন্য প্রত্যেক ঘরে ঘরে ডেঙ্গুর বিষয়ে সুরক্ষা নিতে হবে। নিজের ঘরে যেন ডেঙ্গু উৎপন্ন না হয়। মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হবে।

বিএনপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পরিবহন ধর্মঘটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাস মালিকরা যদি বাস না চালান, তাহলে আমরা কী করতে পারি?

২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালের অগ্নি-সন্ত্রাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ মেরেছে। জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে। এই যাদের অবস্থা, তাদের কি জনগণ ভোট দেবে? খালেদা জিয়া কেন জেলে? তিনি তো দুর্নীতির দায়ে জেলে। অর্থ পাচারে তারেক জিয়া সাজাপ্রাপ্ত। জানি না, বাংলাদেশের মানুষ যদি ভোট দেয়, আমার কিছু বলার নেই।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। আমদানি পণ্য বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্য, সার, বীজ ও তেল আমদানিতে খরচ বেড়েছে।

রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, পণ্য আমদানিতে খরচ বাড়ছে, পণ্য পাওয়া মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে সারা বিশ্ব বিপর্যস্ত। বাংলাদেশ তার থেকে আলাদা না। তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ বেড়েছে। মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়া সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। প্রতিনিয়ত ডলারের দাম বেড়েছে। এতে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশ বা যাদের জ্বালানি তেল, গ্যাস, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানি করতে হয়, তাদের সবাই সংকটে পড়েছে। তারপরও আমাদের সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

দেশের মানুষের কল্যাণের কথা মাথায় রেখে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চেষ্টা করছি মানুষের চাহিদা পূরণ করতে। তারপরও আমাদের ওপর চাপ বেড়ে গেছে। আমদানি করা সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।

বাজেটে সরকার ভর্তুকি ধরে রেখেছিল জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, পরিবহন খরচ বাড়ায় ভর্তুকির চাহিদা বেড়েছে। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ধরা হয়েছিল ১৭ হাজার কোটি টাকা। আজ সেখানে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে ৩২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। যদি আমরা সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ দিতে চাই, তাহলে এই ভর্তুকি দিতে হবে। জ্বালানি তেলে অতিরিক্ত ভর্তুকি লাগছে ১৯ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। খাদ্য আমদানিতে লাগছে চার হাজার কোটি টাকা। টিসিবিসহ জনবান্ধব কর্মসূচিতে অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে নয় হাজার কোটি টাকা। এক কোটি মানুষকে কার্ড দিয়েছি। স্বল্পমূল্যে তাদের খাদ্য দিচ্ছি। মানুষ যাতে কষ্ট না পায়, সেই জন্য দিচ্ছি। কৃষি খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকি লাগছে ৪০ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার ১০৫ কোটি টাকা শুধু ভর্তুকির চাহিদা বেড়েছে।

গ্যাসে প্রতি ঘনমিটারে ১০ টাকা ৬০ পয়সা করে ভোক্তা পর্যায়ে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। শিল্প কারখানার এলএনজির গ্যাসের প্রতি ঘনমিটারে ৪৮ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। সারের ভর্তুকির তথ্য তুলে ধরেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, গত এক বছরে প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বিশ্ববাজারে বেড়েছে। চাল, গম ও আটার দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ করে। আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ব্যয় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরে (জুলাই-অক্টোবর) আয় হয়েছে ১৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে (জুলাই-অক্টোবর) রেমিট্যান্স এসেছে ৭ দশমিক ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে থেকে ২ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছে ২২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ কম।

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!