নভেম্বর ২৯, ২০২২ ১০:০০ পূর্বাহ্ণ || ইউএসবাংলানিউজ২৪.কম

ইউএস বাংলানিউজ, নিউইয়র্ক

অগ্রসর পাঠকের বাংলা অনলাইন

সম্পূর্ণ দৃশ্যমান হলো বিশ্বের দীর্ঘতম ট্রাস সেতু

বিশ্বজুড়েই জনপ্রিয় ট্রাস সেতু। কারণ, ভার বহন করবে বেশি, কিন্তু নির্মাণ উপকরণের ব্যবহার হবে কম। নির্মাণে নেই খুব একটা জটিলতা, নকশাও হবে দৃষ্টিনন্দন। পদ্মা সেতুও নির্মিত হচ্ছে এ প্রযুক্তিতে। এখন পর্যন্ত এটিই বিশ্বের দীর্ঘতম ট্রাস সেতু।

ট্রাস সেতুর ব্যবহার ঠিক কবে পৃথিবীতে শুরু হয়েছিল, তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে পদ্ধতিটি যে বেশ প্রাচীন, তার প্রমাণ মেলে ফ্রেঞ্চ স্থপতি ভিলার্ড দি কোর্তের ত্রয়োদশ শতাব্দীর একটি স্কেচবুকে। এ প্রযুক্তিতে বাংলাদেশে অসংখ্য বেইলি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, ভৈরব ব্রিজ, পাকশী সেতুসহ অনেক রেলসেতু ট্রাস প্রযুক্তিতে নির্মাণ করা।

ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের গোদাবরী সেতুই ছিলো এতদিন ট্রাস প্রযুক্তিতে নির্মিত বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু। দুই লেন সড়ক ও সিঙ্গেল লাইন রেলপথের গোদাবরী সেতুর দৈর্ঘ্য ৪ দশমিক ১ কিলোমিটার। এ সেতুর স্প্যান সংখ্যা ২৭। প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৯১ দশমিক ৫ মিটার। অন্যদিকে পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার।

প্রকৌশলীদের তথ্য মতে, সচরাচর কাঠ বা স্টিলের কাঠামো ব্যবহার করা হয় ট্রাস প্রযুক্তিতে। একটি কাঠামোর সঙ্গে আরেকটি সংযুক্ত করা হয় ত্রিভুজাকৃতিতে। একাধিক ত্রিভুজাকৃতির কাঠামো দিয়ে গড়ে তোলা হয় একেকটি স্প্যান। কাঠামোগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি সংযুক্ত থাকায় তার ভার সব কাঠামোর ওপর সমানভাবে ছড়িয়ে যায়। একইভাবে যানবাহনের ভারও পুরো সেতুতে ছড়িয়ে দেয় তা। এটি শুধু সেতুর কাঠামোকে শক্তই করে না, সেতুকে নানা প্রতিকূলতা থেকে রক্ষাও করে।

ট্রাস প্রযুক্তির কারণে পদ্মা সেতুতে পিয়ারের সংখ্যা কম লেগেছে বলে মনে করেন পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্যানেল অব এক্সপার্ট টিমের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়া। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কংক্রিটের কাঠামোর সেতু করতে হলে এত অল্পসংখ্যক পিয়ার দিয়ে করা সম্ভব হতো না। ট্রাস প্রযুক্তির এ সেতুতে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের একেকটি স্প্যান বসানো হয়েছে। পদ্মা সেতুর স্প্যানগুলোর দৈর্ঘ্য যদি ১৫০ মিটার না হয়ে ১০০ মিটার করে হতো তাহলে পিয়ারের সংখ্যা বেশি লাগত। এতে নির্মাণ ব্যয় ও সময় দুটোই হতো বেশি। সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে নৌ-চলাচলের জন্য। তলদেশে পানিপ্রবাহ ঠিক থাকলে সেতুর যেকোনো প্রান্ত দিয়েই বড় বড় নৌযান চালানো সম্ভব।

তিনি আরও জানান, পদ্মা সেতুতে ট্রাস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে। সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করার সময় তারা সব ধরনের বিষয় পর্যালোচনা করেই এমন পরামর্শ দিয়েছিল। আর সড়ক কাম রেলসেতু করতে হলে ট্রাস প্রযুক্তি ব্যবহার করাই সবচেয়ে সুবিধাজনক বলে মনে করেন তিনি।

সর্বশেষ স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে ১০ ডিসেম্বর, ২০২০ তারিখ বৃহ:বার পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়েছে পদ্মায় নির্মাণাধীন সড়ক কাম রেলসেতু। বুধবারই স্প্যানটি নিয়ে রাখা হয়েছিল দুই প্রান্তের সংযোগস্থলে। এটি সারা রাত ঝুলে ছিল ভাসমান ক্রেনে। ঘন কুয়াশায় স্থাপনকাজ বিঘ্নিত হওয়ার কিছুটা শঙ্কা অবশ্য ছিল। তবে সকালের দিকে কুয়াশা তেমন জুত করে উঠতে পারেনি। ৯টার পর থেকেই উঁকি দিতে শুরু করে সূর্য। এর ঠিক মিনিট চল্লিশেক পরই শুরু হয় পদ্মা সেতুর শেষ স্প্যান বসানোর কাজ। পুরোপুরি বসানো শেষ হয় দুপুর ১২টা নাগাদ। এখন স্প্যানের ভেতরে রেলওয়ে স্ল্যাব আর ওপরে সড়ক স্ল্যাব বসলেই পদ্মা সেতু দিয়ে চলবে গাড়ি।

সেতুর নির্মাণকাজ এখনো শেষ না হলেও এরই মধ্যে তিনটি বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ। পদ্মা সেতুর খুঁটির নিচে সর্বোচ্চ ১২২ মিটার গভীরে স্টিলের পাইল বসানো হয়েছে, যেগুলোর ব্যাসার্ধ তিন মিটার। এত গভীরে এত মোটা পাইল আর কোনো সেতুতে করা হয়নি। সেতুর ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিংয়ের’ সক্ষমতা ১০ হাজার টন, যা সেতুটিকে সর্বোচ্চ ৯ মাত্রা পর্যন্ত ভূমিকম্প থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। এমন বিয়ারিং পৃথিবীর আর কোনো সেতুতে নেই। পদ্মা সেতুর নদীশাসন কাজের চুক্তিমূল্য ১১০ কোটি ডলার। এদিক দিয়েও বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে পদ্মা সেতু প্রকল্প।

পদ্মা সেতুর প্রতিটি পাইলের লোড ৮ হাজার ২০০ টন। আর পিয়ারের লোড ৫০ হাজার টন। পাইলেয়র এ লোড দেয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হ্যামার, যেটি বিশেষভাবে বানানো হয় জার্মান প্রযুক্তিতে, যাতে খরচ পড়েছে ৪০০ কোটি টাকার মতো।

পদ্মা সেতুর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংযোজন ও নির্মাণের জন্য যে ওয়ার্কশপটি তৈরি করা হয়েছে, সেতু তৈরির কাজে এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ওয়ার্কশপ বলে দাবি করছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। এ ওয়ার্কশপের বেশির ভাগ কাজ চলছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে। সর্বশেষ স্প্যান ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ১৫টি রোবট।

২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরুর পর একদিনের জন্যও নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয়নি বলে জানিয়েছেন পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, শুরুর পর থেকে একটানা কাজ করে আসছি আমরা। সাধারণ ছুটি তো বটেই, ঈদের দিনও কাজ চালু রাখা হয়েছে।

চলতি বছর প্রথমে করোনাভাইরাস ও পরে বন্যা কাজ চালু রাখার ক্ষেত্রে বেশ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। করোনার কারণে আমরা প্রকল্পের কর্মীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে কাজ চালু রেখেছি। বন্যার সময় ঝুঁকি নিয়েও চালিয়ে যাওয়া হয়েছে নির্মাণকাজ। কাজে ধীরগতি হয়তো এসেছে, কিন্তু কখনো তা থেমে থাকেনি।

সেতুর জন্য নির্ধারিত ৪১টি স্প্যান বসানোর কাজ শেষ হওয়ায় এখন চলছে স্প্যানের ভেতরে রেলওয়ে স্ল্যাব বসানোর কাজ। একইভাবে স্প্যানের ওপর বসানো হচ্ছে রোডওয়ে স্ল্যাব। স্প্যানগুলোর ভেতরে রেলওয়ে স্ল্যাব বসবে ২ হাজার ৯৫৯টি। সেতু বিভাগ জানিয়েছে, ১ হাজার ৯৪২টি রেলওয়ে স্ল্যাব এরই মধ্যে বসে গেছে। অন্যদিকে ওপরে বসানো হবে সব মিলিয়ে ২ হাজার ৯১৭টি রোডওয়ে স্ল্যাব, যার মধ্যে বসানো সম্পন্ন হয়েছে ১ হাজার ৩৩৩টি। রোডওয়ে স্ল্যাবের ওপর গড়ে তোলা হবে চার লেনের সড়ক।

এখন পর্যন্ত মূল সেতুর বাস্তব কাজের অগ্রগতি শতকরা ৯১ ভাগ। নদীশাসন কাজের বাস্তব অগ্রগতি শতকরা প্রায় ৭৬ ভাগ। এরই মধ্যে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের সংযোগ সড়কের শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি শতকরা ৮২ দশমিক ৫০ ভাগ।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম ১০ ডিসেম্বর, ২০২০ বৃহ:বার এক অনুষ্ঠানে ২০২২ সালের জুন নাগাদ পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরু হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

সেতু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সূত্র মতে, ২০২২ সালের মধ্যেই পদ্মা সেতু জনকল্যাণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!