অক্টোবর ২৯, ২০২০ ১০:১৬ অপরাহ্ণ || ইউএসবাংলানিউজ২৪.কম

ইউএস বাংলানিউজ করপোরেশন, নিউইয়র্ক

অগ্রসর পাঠকের বাংলা অনলাইন

কছু কি লুকিয়ে রাখা উচিত?

তসলিমা নাসরিন : কিছুদিন আগে সিএনএনের ‘বিলিভার’ সিরিজে উপ¯’াপক রেজা আসলান নরমাংসভোজি আঘোরিদের দেখিয়েছেন। আঘোরি সাধুরা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক। হাজার বছর এরা পথ হাঁটিতেছে পৃথিবীর পথে। বেনারসে, গঙ্গার ঘাটেই এদের জীবন যাপন। নেংটি পরে বটে, তবে উলঙ্গই থাকে। শীতে গ্রীষ্মে উলঙ্গই। অনেকে বিশ্বাস করে, সমাজের সব বন্ধন ছিন্ন করে, কামনা বাসনা বিনাশ করে এরা চেষ্টা করছে মোক্ষ লাভ করতে। যন্ত্রণাময় জীবন ফিরে পেতে এদের আর পূণর্জন্ম হবে না। এরা মানুষের মৃতদেহ পোড়ানো ছাই সারা গায়ে মেখে রাখে। মানুষের হাড়গোড় হাতে নিয়ে বা গলায় ঝুলিয়ে চলাফেরা করে। মদ্য পান করে মাথার খুলি থেকে। খায় মরা মানুষের মাংস।
রেজা আসলানের সারা মুখে এক আঘোরি মেখে দিয়েছে মানুষ পোড়ানো ছাই। মাথায় পরিয়ে দিয়েছে মানুষের হাড়গোড় দিয়ে বানানো মালা। তাকে কাঁচা খেয়ে ফেলার হুমকি দিয়েছে। রেজা আসলানকে বাধ্য করেছে মানুষের মগজ খেতে। তারপরও সেই আঘোরি নিজের মল মুত্র সিএনএনের ক্যামেরার এবং ক্রুদের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে, সবাই ‘ছেড়ে যে মা কেঁদে বাঁচি’ বলে পালিয়েছে। বিলিভার সিরিজের এই এপিসোডটি প্রচার হওয়ার পর সিএনএনের তীব্র সমালোচনা করছে অনেকে, বিশেষ করে হিন্দুরা। বলছে আমেরিকায় কয়েকজন নিরপরাধ হিন্দুকে ঘৃণার শিকার হয়ে মরতে হয়েছে। এই সিরিজ দেখার পর আমেরিকার লোকেরা হিন্দুদের সবাইকে নরমাংসভোজী বলে ভাববে, তাদের ঘৃণা করতে শুরু করবে, কে জানে হয়তো হিন্দু দেখলেই ‘গো ব্যাক টু ইয়র কান্ট্রি ক্যানিবাল’ বলে ঢিল ছুঁড়বে, কে জানে হত্যা করতেও হয়তো শুরু করবে।
কিছু অদ্ভুত মানুষ পৃথিবীতে আছে, যারা কিছু ইহুদি মৌলবাদি বা মুসলিম সন্ত্রাসী দেখে পুরো ইহুদি বা মুসলিম সম্প্রদায়টাকেই ঘৃণা করে, ব্রংসের কিছু আফ্রিকান আমেরিকানের কার্যকলাপ পছন্দ হয়নি বলে পুরো কালো মানুষদের এখন তাদের অপছন্দ, চীনে রেস্তোঁরায় গিয়ে দু’টো চীনে লোকের দুর্ব্যবহার পেয়ে বলে দিলো পুরো চীনটাই খারাপ, বাংলাদেশের কিছু ব্লগারকে সন্ত্রাসীরা খুন করেছে বলে বাংলাদেশটাই খুনির দেশ, সৌদি আরবের মুসলমান বাদশাহ একাধিক বিয়ে করেছে বলে সব মুসলমানই একাধিক বিয়ে করে। ঠিক এভাবেই কেউ হয়তো কিছু আঘোরিকে দেখে বলবে পুরো হিন্দু জাতটাই ন্যাংটো ঘুরে বেড়ায় আর মরা মানুষের মাংস খেয়ে বাঁচে। না, এমন সাদা-কালো বিচার এ ঠিক নয়।
আজ যে হিন্দুরা আঘোরিদের দেখে সব হিন্দুদের আঘোরি বলে ভাবা হবে বলে ভয় পা”েছ, সে হিন্দু্দরে অনেকেই হয়ত আইসিসের সন্ত্রাস দেখে ভেবেছিল সব মুসলমানই এমন সন্ত্রাসী। অনেক সময় যা আমরা অন্যকে নিয়ে ভাবছি তা আমাদের নিয়ে কেউ ভাবছে বলে মনে করি না। বিভিন্ন ব্যক্তি নিয়ে গোষ্ঠী তৈরি হয়, বিভিন্ন ব্যক্তির বিশ্বাস বিভিন্ন। গোষ্ঠীর বিশ্বাস বলে কিছু নেই, গোষ্ঠির আচরণ বলেও কিছু নেই। আঘোরিদের বিশ্বাস যেমন সব হিন্দুর বিশ্বাস নয়, আইসিসের বিশ্বাসও সব মুসলমানের বিশ্বাস নয়। সম্ভবত হিন্দুরা এখন তা উপলব্ধি করবে। সামান্য উপলব্ধি তো করেছে এর মধ্যে। ট্রাম্পকে সমর্থন করেছে ট্রাম্প মুসলিমদের এক হাত নেবে বলে, উল্টে ট্রাম্প সমর্থকরা মুসলিমদের খুন করার বদলে শিখ আর হিন্দুদের খুন করছে, হিন্দু মুসলিম দেখতে একই রকম কিনা।
সিএনএনের নিন্দে করছে প্রচুর লোক। নিন্দে করুক, আমি কিš‘ মনে করি সিএনএন যা করেছে ঠিকই করেছে। পৃথিবীর কোনও তথ্যই গোপন রাখা উচিত নয়। কোন গোষ্ঠী কী করছে, কী তাদের চিন্তা ভাবনা, সব আমরা জানবো না কেন? এটা জানালে কারও অনুভূতিতে আঘাত লাগবে সুতরাং জানানো উচিত হবে না, ওটা জানালে মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে গ-গোল বাঁধাতে পারে, সুতরাং ওটা জানানো উচিত হবে নাÑএসব শিশুতোষ জিনিস অনেক হয়েছে। আমি এভাবে তথ্য লুকিয়ে রাখায় বিশ্বাস করি না। তথ্য জানার অধিকার সবার আছে। তথ্য জানার পর কেউ যদি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে চায় বা ঘটায় তবে তা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব সরকারের আইনশৃংখলা বাহিনীর। কিš‘ তথ্য প্রকাশ করা যাবে না, সত্য বলা যাবে না কারণ দাঙ্গা লেগে যেতে পারে– দাঙ্গার ভয় দেখিয়ে বাক স্বাধীনতার লাগাম ধরা হ”েছ, মত প্রকাশের অধিকার লঙ্ঘন করা হ”েছ কি আজ থেকে? এসব ছেলেমানুষী লুকোছাপা এবার বন্ধ হোক।
আমি জানতাম না আঘোরিরা মড়া-পোড়া-ছাই মাখে শরীরে। আমি জানতাম না আঘোরি সাধুরা মড়ার মাংস খায়। মাথার খুলি তাদের পানপাত্র। কত কিছু অজানা ছিল। আমি জানি এখনও আফ্রিকার কিছু দেশে, পাপুয়া নিউগিনিতে, ফিজিতে কিছু মানুষ-খেকো মানুষ আছে। এসব তথ্যচিত্র আমার জানার পরিধি বাড়ায়, আমার ঘৃণার পরিধি বাড়ায় না। প্রাণীকূলের বিচিত্র স্বভাবের কারণে আমি কোনও প্রাণীকে ঘৃণা করি না, যদি না সেই বিচিত্র স্বভাব জেনে বুঝে কারও ক্ষতি করে। এসব তথ্যচিত্র সবচেয়ে বড় যে কাজটি করে, অনেককে শোধরাতে সাহায্য করে, অনেকে বুঝতে পারে না তারা কী বি”িছরি কাজ করছে, যতক্ষণ না চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেওয়া হয় তারা কী করছে।
হিন্দুদের সবাই যে আঘোরিদের অশ্রদ্ধা করে তা ঠিক নয়। অনেক হিন্দুই আঘোরিদের অত্যন্ত সম্মান করে, সাষ্টাঙ্গে প্রণাম ক’রে আঘোরিদের আশির্বাদ নেয়। দূরারোগ্য রোগের ওষুধ আনতে ওদের শরণাপন্ন হয়। আঘোরিদের অনেকে প্রশংসা করে, বলে ওরা জীবন্ত কোনও কিছু খায় না, জীবন্ত কাউকে ওরা মারে না, ওরা মহৎ। আঘোরিরা যত উদ্ভট কা-ই করুক, অন্যের ক্ষতি করে না। সন্ন্যাসী আর সন্ত্রাসী এক নয়।
রেজা আসলানকে আমি দোষ দিই না। তিনি আঘোরিদের ওপর যে তথ্য চিত্র করেছেন, যে ভয়াবহ দৃশ্য তিনি দেখিয়েছেন তার তুলনা হয় না, যে অব¯’ায় পড়ে তিনি মরা মানুষের মস্তিস্কের টুকরো খেয়েছেন তা না দেখলে বিশ্বাস হবে না। ওই সময় আমিও হয়ত ওসব অখাদ্য খেতে বাধ্য হতাম। রেজা আসলান বলেছেন মস্তিস্কের স্বাদ ছিল কয়লার মতো। আসলে পুড়ে তো অঙ্গার হয়েছে সব, কয়লার মতো হবেই। জীবনের ঝঁকি নিয়ে তিনি তথ্য চিত্রটি করেছেন, তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাই।
কোনও কোনও হিন্দু সম্ভবত লজ্জা পা”েছ তাদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বন্য বর্বর মানুষ, এ-কথা মেইন্সট্রিম মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়ে গেলো বলে। কেউ কেউ অবশ্য আঘোরিদের নিয়ে গৌরব করতে চাইছে। যে যা কিছুই ভাবুক, সবার কাছে সব কিছু খুলে দেখানোই ভালো। লুকিয়ে রেখে শেষ অবধি লাভ কিছু হয় না। ভারত সাধু সন্ন্যাসীদের দেশ, ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কারের দেশ, ভারত আবার শিল্প সাহিত্যের দেশও, ভারত বিজ্ঞানেরও দেশ, ভারত একটি রকেট থেকে ১০৪টি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
কোনও দেশকে বা জাতিকে বা মানবগোষ্ঠীকে সেই দেশ বা জাতি বা মানবগোষ্ঠীর কারও কারও আচরণ দ্বারা বিচার করা উচিত নয়। সন্ন্যাসী বা সন্ত্রাসীদের বিকৃত আচরণের জন্য সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেন না হয়। ধর্মান্ধতা মানুষকে অমানুষ বানিয়ে ফেলে। মস্তিষ্ককে পুরো অকেজো করে দেয়। ধর্মান্ধতা থেকে বাঁচতে পারলেই অনেকটা বাঁচতে পারবে মানুষ।

বাংলাট্রিবিউন

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!