নভেম্বর ২৯, ২০২২ ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ || ইউএসবাংলানিউজ২৪.কম

ইউএস বাংলানিউজ, নিউইয়র্ক

অগ্রসর পাঠকের বাংলা অনলাইন

উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা পাকিস্তানের গলার কাঁটা

পাকিস্তানে একসময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রধান সমস্যা ছিল উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতি। এ সমস্যাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে গিয়েছে দেশটি। ঘাটতি কাটিয়ে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার দেশে রূপ নিয়েছে পাকিস্তান। তবে এ সক্ষমতাই এখন গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে দেশটির।

গেলো কয়েক বছরে একের পর এক কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে গিয়েছে পাকিস্তান। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের অধিকাংশেই অর্থায়নের উৎস ছিল চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ২০১৩ সালে শুরু করা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্প। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিদ্যুৎ খাতবিষয়ক বিশেষ সহকারী তাবিশ গওহরের উদ্ধৃতি দিয়ে দেশটির স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ২০২৩ সাল নাগাদ দেশটির মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৫০ শতাংশই থেকে যাবে উদ্বৃত্ত হিসেবে।

তবে, উদ্বৃত্ত উৎপাদন হলেও দেশটির গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সমস্যারও কোনো সমাধান হয়নি। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন জীর্ণশীর্ণ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে। দেশটির জাতীয় গ্রিডকে এখন পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়ে কার্যকরভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহে সক্ষম করে তোলা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ডভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বিশ্লেষক সাইমন নিকোলাসের এ বিষয়ে মন্তব্য, পাকিস্তানের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন অতিরিক্ত। তার পরও অনির্ভরযোগ্য গ্রিডের কারণে দেশটিকে বিদ্যুৎ ঘাটতিতে ভুগতে হয়। তারা যেভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ করেছে, গ্রিড ব্যবস্থার উন্নয়নে সেভাবে বিনিয়োগ করেনি।

বিদ্যুৎ খাতে বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতার দাবিদার হলেও এ বিষয়টিই এখন পাকিস্তানের চাপে থাকা অর্থনীতিকে আরো সংকটাপন্ন করে তুলেছে। কেউ কেউ বিষয়টিকে দেখছেন দেশটির সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। সম্প্রতি দেশটির সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়েছে ১ রুপি ৯৫ পয়সা করে (বাংলাদেশী মুদ্রায় বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী ১ টাকা ৩ পয়সার সমপরিমাণ)।

সক্ষমতা বাড়া সত্ত্বেও এ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে দায়ী করা হচ্ছে দেশটির বিদ্যুৎ খাতের সার্কুলার ডেবট বেড়ে যাওয়াকে। সার্কুলার ডেবট মূলত এক ধরনের সরকারি ঋণ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে পাকিস্তান সরকার ভর্তুকি বাবদ প্রদেয় বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ঋণের যে দুষ্টচক্র তৈরি হয়, সেটিকেই অভিহিত করা হয় সার্কুলার ডেবট হিসেবে। এক্ষেত্রে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি বাবদ প্রাপ্য অর্থ পাওয়া না গেলে বিতরণ কোম্পানিগুলো বেসরকারি বা স্বাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে (আইপিপি) প্রতিশ্রুত অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়।

এর ধারাবাহিকতায় উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোও জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে যায়। এ সার্কুলার ডেবট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পাকিস্তানের গোটা বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত এবং এর ধারাবাহিকতায় দেশটির সার্বিক অর্থনীতিতেই বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে পাকিস্তানি বিদ্যুৎ খাতে সার্কুলার ডেবটের পরিমাণ বাড়ছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। গত বছরের সেপ্টেম্বরেও দেশটির বিদ্যুৎ খাতে মোট সার্কুলার ডেবটের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি রুপি। চার মাসের মাথায় বর্তমানে তা ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি রুপি (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা) ছাড়িয়েছে।

নওয়াজ শরিফ সরকারের অর্থমন্ত্রী মিফতাহ ইসমাইল সম্প্রতি বিষয়টির সমালোচনা করে গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা যখন ক্ষমতা ছাড়ি, তখন বিদ্যুৎ খাতের লোকসান ও ব্যাংকঋণ যোগ করে মোট সার্কুলার ডেবটের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৬০০ কোটি রুপি। এখন তা ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি ছাড়িয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য বলছে, পাকিস্তানে ২০১৯-২০ (জুলাই ২০১৯- জুন ২০২০) অর্থবছরে সার্কুলার ডেবট বেড়েছে ৫৩ হাজার ৮০০ কোটি রুপি। অর্থাৎ এ সময় দেশটিতে সার্কুলার ডেবট বেড়েছে প্রতি মাসে গড়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি রুপি করে। বিষয়টি পাকিস্তান সরকারের কাছে এখন সাদা হাতি পোষার সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ দেশটির উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বিদ্যুতের একমাত্র ক্রেতা পাকিস্তান সরকার। উপরন্তু অনেকগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও তাদের বসিয়ে বসিয়ে প্রচুর পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে ইসলামাবাদকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সার্কুলার ডেবট বাবদ পাকিস্তান সরকারকে এভাবে দেনাগ্রস্ত করার পেছনে স্বাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র বা আইপিপিগুলোর অবদানও কম নয়। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবসায়িক ঝুঁকির বড় একটি অংশ বহন করে পাকিস্তান সরকার। একই সঙ্গে দেয়া হয় নির্দিষ্ট হারে মুনাফার নিশ্চয়তাও। দেশটির ১৯৯৪ সালের জ্বালানি নীতির অধীনে পাকিস্তান সরকার আইপিপিগুলোকে দুটি অংশে অর্থ পরিশোধ করে। এর মধ্যে প্রথমটি দেয়া হয় সক্ষমতা বাবদ (ক্যাপাসিটি পেমেন্ট), দ্বিতীয়টি দেয়া হয় জ্বালানি বাবদ (এনার্জি পেমেন্ট)। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পরিশোধ করা হয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থির ব্যয় বা ফিক্সড কস্ট হিসেবে। এক্ষেত্রে চুক্তিবদ্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে বেকার বসে থাকলেও তাদের অর্থ পরিশোধ করতে হয় পাকিস্তান সরকারকে।

আর বিদ্যুৎ খাতের বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতা যে এখন ইসলামাবাদের গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে, বিষয়টি স্বীকার করছে পাকিস্তান সরকারও। এর সঙ্গে বাড়তি চাপ হিসেবে রয়েছে কার্বন নিঃসরণকে নিয়ন্ত্রণে রেখে গ্রাহকদের সস্তা মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার চ্যালেঞ্জও। ইমরান খানের বিদ্যুৎ খাতবিষয়ক বিশেষ সহকারী তাবিশ গওহর জানিয়েছেন, এ সমস্যা মোকাবেলা করতে দেশটির সরকার এখন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসছে। এছাড়া তাদের ট্যারিফ কমানোর পাশাপাশি নতুন প্রকল্প গ্রহণ বিলম্বিত করতেও বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে উৎপাদনকারীদের বিদ্যুতে গ্যাসভিত্তিকে রূপান্তরের জন্যও উৎসাহ দেয়া হচ্ছে।

তাবিশ গওহর এ বিষয়ে মন্তব্যে বলেছেন, আমাদের ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে প্রচুর। সেটিও এখন অনেক বড় এক বোঝা হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তান দীর্ঘকাল বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে ভুগেছে। এর কারণে দেশটির রফতানিকারকদের ক্রয়াদেশ অনুযায়ী সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দিতে না পারার রেকর্ডও রয়েছে অনেক। বড় শহরগুলোকেও দিনের বড় একটি অংশ কাটাতে হয়েছে বিদ্যুত্হীন অবস্থায়। এ কারণে চীনা অর্থায়নে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টিকে শুরুতে স্বাগতই জানিয়েছিলেন খাতসংশ্লিষ্টরা। কিন্তু বর্তমানে তাদের অভিমত হলো, ভুল বিদ্যুৎ নীতির কারণে গোটা বিষয়টিই এখন পাকিস্তানের জন্য অনেক ভারী বোঝা হয়ে দেখা দিয়েছে। যা রীতিমতো বড় ধরনের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!