ডিসেম্বর ৯, ২০২২ ৬:৫০ অপরাহ্ণ || ইউএসবাংলানিউজ২৪.কম

ইউএস বাংলানিউজ, নিউইয়র্ক

অগ্রসর পাঠকের বাংলা অনলাইন

বদলে যাওয়া একটি বিকেল

আজ কয়েকদিন যাবত সুমনের মনটা খারাপ। ইউনিভার্সিটিওযাচ্ছে না। বিকেলে আগের মত বন্ধুদের সাথে আড্ডাও দিচ্ছে না।সুমনের মা বিষয়টি লক্ষ্য করেছে। ছেলের হঠাৎ পরিবর্তনটা তার ভালোলাগছে না। -সুমন আজও ভার্সিটিতে গিল না। কি হয়েছে তোর?মায়ের এই কথা শোনে সুমন বিছানা থেকে ওঠে বসে। তারপর মায়েরদিকে তাকিয়ে বলে– না মা, শরীরটা ভালো লাগছে না। তাছাড়া আজ গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসনেই। আগামীকাল থেকে যাবো মা, তুমি চিন্তা করো না। সুমনের কথায় মা খুশী হতে পারলো কিনা বুঝা গেলো না। কিছুক্ষণসুমনের দিকে তাকিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুমথেকে বেরিয়েগেল। সুমন ওঠে বাথরুমে গলো। বাথরুমের আয়নার সামনে অনেক্ষণদাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে আর অবাক হচ্ছে। খোচা খোচা দাড়িগজিয়েছে। চোখের নীচে কালি পরেছে। সুমন আজকাল কেমন যেনশূন্যতা অনুভব করে। মনে হয় কি যেন নেই। এজন্য কি মৌ দায়ী?মৌ তো ছিল মাত্র ৬ মাস।

মৌ সুমনের দু:সম্পর্কের চাচাতো বোন। ইউনিভার্সিটিতেভর্তি হয়েছে। তবে এখনও হলে সিট পায়নি। আবার অন্য কোনআত্বীয়ও নেই ঢাকায়। তাই বাধ্য হয়ে সুমনদের বাসায় ওঠেছিল।ওখান থেকেই প্রতিদিন ইউনিভার্সিটি যেত। মাঝে মাঝে সুমনেরসাথে রিক্সায় করে একসাথে যেত। প্রথম প্রথম সুমন একসাথে যাওয়াপছন্দ করতো না। সুমনের মায়ের অনুরোধেই মৌকে সাথে করে নিয়েযেত। এতে করে মৌ-এর সুবিধাই হয়েছিল। অচেনা ঢাকা শহরে অন্তত একজন তো পাওয়াগেল যে তাকে সময় দিচ্ছে। মৌ বুঝতে পারতোসুমন তার সান্নিধ্যে পছন্দ করছে না। নানান উছিলায় সুমনমৌকে এড়িয়ে চলতো। মাঝে মাঝে কোন প্রয়োজনে বাইরে যেতেচাইলে সুনম তার মাকে বলতো-তুমিই নিয়ে যাও। আমার অনেক কাজ আছে।

মৌ মাঝে মাঝে দড়জার আড়াল থেকে সুমনের কথা শোনে ফেলতো। তখনতার মন খারাপ হয়ে যেত। মৌ ভাবতো হয়তো সে গরীব ঘরের মেয়ে,তাদের বাসায় আশ্রিতা তাই অন্যচোখে দেখে।

মৌ ভার্সিটির হলে এবার একটি সিট পেয়েছে। তাই বাসা ছেড়েদিয়েছে। এতদিন একটি ফ্যামিলির সাথে ছিল, এখন হলে ওঠে তারঅন্যরকম লাগছে। কিছুটা শূন্যতা সেও অনুভব করছে। হলের মেয়েদেরসান্নিধ্য পাচ্ছে, হৈচৈ হচ্ছে, তবুও কি যেন নাই। সেকিসুমনকে কিছুটা ভালোবেসে ফেলেছিল? সবকিছুতেই সে সুমনের ওপর ক্রমশ: নির্ভর হয়ে পড়েছিল। ভার্সিটিতে যাওয়া, কেনাকাটাকরা, ফুসকা খাওয়া, এসব ছোট খাটো বিষয়গুলো আজ কেন বারবারমনে পরছে? কোনদিনও তো সুমনকে নিয়ে সে অন্যরকম কিছুই চিন্তা করেনি। তবে এসব ভাবনা কেন আসছে? সুমন তো তাকেএড়িয়ে চলারই চেষ্টা করতো।

আজ অনেকদিন পর সুমন ভার্সিটিতে যাচ্ছে। ঘরথেকে বের হয়েই রিক্সা নিল। রিক্সাতে ওঠেই তার কাছে কেমন যেন শূন্যতা মনে হচ্ছে।মনে হচ্ছে কি যেন নেই। ভার্সিটির কলা ভবনের মাঠের কর্ণারে চটপটির দোকানের সামনে রিক্সা থামলো। মনটা কেমন যেন হাহাকার করে ওঠলো। ফুসকা খেতে মনে চাইছিল, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো মৌথাকলে তো ফুসকার পেট ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো, আর সে টপাটপগিলতো। তারপর বলতো ও সরি সরি, আমি সব খেয়ে ফেললাম, আপনার জন্য মাত্র একটি আছে। মৌ হেসে বলতো, কিছু হবে না; আমার একটিই হবে। আপনি চাইলে এই একটিও খেতে পারেন।সুমন অট্ট হাসি দিল। আবার এক পেটের ফুসকা অর্ডার করে সেপেট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এভাবেই সে দিনগুলো কেটেছে। সুমন অনেকক্ষণ ফুসকাওয়ালার দিকে তাকিয়ে থেকে ক্লাসের দিকেদৌড়ে যেতে লাগলো। সুমনের মা বলে দিয়েছে আজ যেন মৌকেসাথে করে বাসায় নিয়ে আসে। আগামীকাল ছুটি, তাই একদিনযেন এসে থেকে যায়। লোকাল অবিভাবক হিসেবে সুমনদের ঠিকানাহলে দেয়া আছে। তাই কোন অসুবিধা হবে না। সুমন ক্লাস শেষকরে কখন মৌ এর হলে যাবে সেই চিন্তায় ব্যস্ত। ঠিকমত ক্লাসেমনও বসাতে পারছে না। মৌ এর ক্লাস আজ তাড়াতাড়িই শেষ হলো। পরের সপ্তাহেই ঈদেরছুটি। দেশে চলে যাবে। দেশ থেকে বাবা হাত খরচ বাবদ এবং ঈদের কেনাকাটা করার জন্য বেশ কিছু টাকাও পাঠিয়েছে। মৌ ভাবলো এই সুযোগে কিছু কেনাকাটা করলে সময়টা সেইভ করা যাবে। পাশেইএকটা মার্কেটে চলে গেল। এদিকে সুমন ক্লাস শেষ করেই দ্রুত মৌ এর হোস্টেলের সামনে এসেদাঁড়িয়ে রইলো। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও মৌ এর দেখা পেলো না।মনে মনে অনেক পরিকল্পনা করে রেখেছে। মৌকে পেলেই প্রথমে আজ চটপটি খাবে। তারপর রিক্সা করে ঘরে ফেরা যাবে। অনেকদিন ফুসকাখাওয়া হয় না। মৌকে আজ জিজ্ঞাসা করবে কেন তাদের বাসা থেকে হোস্টেলে এসেছে। তাদের তো কোন সমস্যা হচ্ছে না। আরো কতোকি ভাবনা। এসব ভাবছে আর এদিক ওদিক তাকাচ্ছে মৌ এর আসার পথের দিকে। হঠাৎ করেই একটি রিক্সা এসে থামলো হোস্টেলের সামনে। মৌ রিক্সা থেকে নামলো। মৌ এর দুই হাতে শপিং এর প্যাকেট। পাশে বসাসুদর্শন এক যুবক। দু’জনকে বেশ প্রানোচ্ছল দেখাচ্ছিল। এ দৃশ্য দেখে সুমন যেন থমকে গেছে। কি করবে বুঝে ওঠতে পারছে না। সেকি মৌ এর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? কি বলবে সে? সে তো কোনসময় মৌকে সহজভাবে নেয় নি। মৌ তা জানে। এই ৬ মাসে একবারওতো সে মৌ এর কোন খবর নেয় নি। কিসের দাবী নিয়ে সে মৌ এরসামনে দাঁড়াবে? মৌ হয়তো তার নতুন বন্ধু খুঁজে নিয়েছে।হয়তো এই বন্ধুত্ব শুধুই বন্ধুত্ব, অন্য কিছু নয়। আবার এর উল্টোটাও হতে পারে। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে অনেক সময় চলে গেল। মৌততক্ষণে হোস্টেলের ভেতরে প্যাকেটগুলো রেখে সেই সুদর্শন যুবকটিকে নিয়ে হাটতে হাটতে হোস্টেলের সামনে একটি চটপটির দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো।

আর কিছু দেখার প্রয়োজনবোধ করলো না সুমন। সে রাস্তা দিয়েহাটতে শুরু করলো। নিজেকেই সে বোঝাতে চেষ্টা করলো; এটাই স্বাভাবিক। মানুষের জীবনে অনেক কিছু মুহুর্ত আসে যা মানুষঠিক সেই সময়ে উপলব্ধি করতে পারে না। পরবর্তীতে তার জন্যআফসোস করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। শূন্যস্থান বেশী দিনশূন্য থাকে না। কোন না কোন ভাবে সেই শূন্যস্থান পূরণ হয়েযায়। কখনও ভূল করে, কখনও বা সময়ের প্রয়োজনেই। সুমনের জীবনেহয়তো কাল থেকে আরো একটি নতুন ভোর আসবে। মৌ হয়তো জীবনের স্রোতে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। হয়তো কোন বৃষ্টির দিনে ফুসকা খাওয়ার সময় অথবা অন্য কোন সময়ে একটু শূন্যতা অনুভব হবে। এভাবেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা আসে। কখন যে একটি সুন্দর বিকেল বিবর্ণ হয়েগেল তা বুঝতে পারে নি সুমন।

লেখক: আবু সাঈদ রতন
কলামিস্ট, সাহিত্যিক-নিউইয়র্ক
সম্পাদক, ইউএসবাংলা নিউজ।

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!