JavaScript must be enabled in order for you to see "WP Copy Data Protect" effect. However, it seems JavaScript is either disabled or not supported by your browser. To see full result of "WP Copy Data Protector", enable JavaScript by changing your browser options, then try again.
লাকী আখন্দ্ – ফেলে আসা জীবনের কথা

লাকী আখন্দ্ – ফেলে আসা জীবনের কথা

লাকী আখন্দ্

ফেলে আসা জীবনের কথা

গান গানই

লাকী আখন্দ্ ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন এখন। তাঁর ফেলে আসা জীবনের কথা শুনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

আপনার আসল নাম তো এ টি এম আমিনুল হক। সেটি লাকী আখন্দ্ কিভাবে হলো?
প্রথমে আমার নাম ছিল এ টি আমিনুল হক।

মা বদলে এ টি এম আমিনুল হাসান করলেন। ম্যাট্রিকের সার্টিফিকেটেও এ নাম আছে। তবে যুদ্ধের সময় ভারতে আমার ছদ্মনাম ছিল লাকী আনাম। কারণ মা-বাবা দেশে থাকেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমার গান বাজে। আর্মিরা কোনোভাবে আসল পরিচয় জানলে তাঁদের মেরে ফেলতে পারে। ফিরে আসার পর পূর্বপুরুষের পদবি নিয়ে নিজের নাম রাখলাম—লাকী আখন্দ্।

‘হ্যাপি টাচ নামে আপনার একটি ব্যান্ডও ছিল।
হ্যাপি থাকতে ১৯৭৩ সাল থেকে আমাদের একটি ব্যান্ড ছিল। আমি তো রেডিও-টিভিতেই বেশি কাজ করতাম। ফলে এটি ব্যান্ড হিসেবে ততটুকু ছিল না, ভাঙা, ভাঙাভাবে ছিল। খুব বেশি পারফরম্যান্স ছিল না। একটানা ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ব্যান্ডটি ছিল। তারপর ১৯৮৭ সালে যখন হ্যাপি মারা গেল—আমরা যারা একসঙ্গে ছিলাম, ব্রিটিশ কাউন্সিলে গিয়ে বলেছিলাম, হ্যাপি নামে আমাদের সঙ্গে একজন মিউজিশিয়ান ছিল, এই ব্যান্ডে তারই অবদান বেশি। ফলে আমরা ভাবছি—হ্যাপি স্কাই বা এই নামে ব্যান্ডের নাম রাখতে চাই। ব্রিটিশ কাউন্সিলের কালচারাল সেক্রেটারি ভদ্র মহিলা এ কথা শুনে বললেন, এই নামগুলো তেমন ভালো নয়। বাট হ্যাপি টাচ ইজ ভেরি টাচি।
হ্যাপি আখন্দ সম্পর্কে কিছু বলবেন?  
সে আমার ১০-১২ বছরের ছোট। ঢাকা মেডিক্যালে তার জন্মের পর আমিই তাকে বাসায় নিয়ে এসেছি। হাতের মধ্যে একটি পয়সা দিয়ে রেখেছিলাম। বাসায় ফিরে দেখি, পয়সাটি তখনো মুঠোর মধ্যে ধরা আছে। বাবার কাছ থেকে আমাদের গানের প্রতি ভালোবাসার শুরু। আমাদের বাবা এ কে আবদুল হক গ্রেট মিউজিশিয়ান ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ আর্মিতে লেফটেন্যান্ট ছিলেন। আর্মি থেকে চলে আসার পর তাঁর গানের প্রতি ভালোবাসা জন্মে। লক্ষৌতে মনিজ কলেজে পাঁচ-সাত বছর ক্লাসিক্যাল, ঠুমরি ইত্যাদি শিখেছেন। তিনি গানের একেবারে পাগল ছিলেন। সন্ধ্যা ৭টায় হারমোনিয়াম নিয়ে বসতেন। ঠুমরি, এটা-ওটা গাইতে গাইতে রাত ৩টা বেজে যেত। এগুলো শুনেই তো আমরা বড় হয়েছি। তবে বাবার কাছ থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমি কিছু শিখিনি। এভাবেই শিখেছি। আর যা জেনেছি, হ্যাপিকে শিখিয়েছি। হ্যাপিকে আমি অনেক দুঃখ দিয়েছি। তখন আমাদের অনেক অভাব ছিল, দুঃখ-যন্ত্রণা ছিল। তবে সংসারে যদি অভাব না থাকত, আমাদের ভেতরে যদি কষ্ট না থাকত; তাহলে আমাদের ভেতরে মিউজিক ঢুকত না। যেহেতু পরিবারে অনেক বেদনা ছিল, ফলে গান শুনে শান্তি পেতে চাইতাম। তখন থেকেই স্পেন, গ্রিসের মিউজিক আমাকে স্পর্শ করে। এগুলোই আমার গানে বেশি ব্যবহার হয়েছে। কোনো শিক্ষক পাইনি। তবে নিজে নিজে শিখতে চেষ্টা করেছি।
আপনি তো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে অংশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন?
১৯৭১ সালের মে মাসে যখন প্রথম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গেলাম, সমর দাশ, আব্দুল জব্বার, আপেল মাহমুদ আমাকে হিংসা করে বের করে দিলেন। বললেন, আমাদের এখন মিউজিক ডিরেক্টর লাগবে না। বললাম, ঠিক আছে, তাহলে আমার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন। তাঁরা করতে রাজি হলেন না। সমর দাশ উল্টো বললেন, আপাতত তুমি চলে যাও। আমরা তোমাদের নিয়ে মিটিং করব। তারপর জানাব। তখন কাজ করবে। এরপর তো শ্যামল মিত্রের চিঠি নিয়ে এইচএমভি ভারতে চলে গেলাম। তার আগেই তো ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান এইচএমভিতে কাজ করেছি। তারা আমার কথা জানত। তখন সেখানে ‘একটা গান লেখো আমার জন্য’ গানটির রিহার্সাল হচ্ছিল, সুরকার ছিলেন অভিজিৎ ব্যানার্জি। আরো অনেক সিনিয়র মিউজিশিয়ানও তখন সেখানে ছিলেন। সেই দুপুরে তাঁরা আমার চিঠি খুললেন। সেখানে লেখা—‘এই ছেলেটি বাংলাদেশ থেকে এসেছে। সে পাকিস্তান এইচএমভির ট্রেইনার। ওকে দিয়ে যদি কিছু সম্ভব হয়, দেখেন, তাকে সাহায্য করতে পারেন কি না। ’ তারপর তাঁরা আমাকে দেখে বসতে বললেন। চা-বিস্কুট দিলেন। সেখানে সন্তোষ সেনগুপ্তও ছিলেন। টি-ব্রেকে অভিজিৎ ব্যানার্জি অডিশন নিলেন। হারমোনিয়াম পেয়ে তো মেলোডির ঝড় উঠিয়ে দিলাম। আমি শুধু জানতাম যে অন্য কোথাও পাই বা না-পাই, ভারতে চান্স পাবই। হঠাৎ শুনি, চায়ের কাপে ঠিকই টুংটাং শব্দ হচ্ছে। তাকিয়ে দেখি, প্রতীমা বন্দ্যোপাধ্যায় গানের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছেন। এরপর হঠাৎ অভিজিৎ ব্যানার্জি উঠে চলে গেলেন। ততক্ষণে প্রায় ৩০ মিনিট গেয়ে ফেলেছি। ভেতর থেকে ম্যানেজিং ডিরেক্টর এসে বললেন, ‘তোমার দুখানা-দুখানা চারখানা গান করার প্রস্তাব এসেছে। দুটি করবেন সত্য সেনগুপ্ত আর দুটি গোরাচাঁদ মুখার্জি। ’ এরপর বললেন, ‘কোথায় থাকা হচ্ছে?’ বললাম, আপাতত হাওড়ায়। তবে যার কাছে থাকি তিনি  ঘরজামাই। যেকোনো সময় বের করে দিতে পারে। তখন রেল স্টেশনে ঘুমাতে হবে। এ কথা শুনে তিনি হাওড়া সার্কিট হাউসের একটি রুমে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। তবে রেকর্ডে খুব যে ভালো মিউজিক করেছি, তা নয়। তখন আমার বয়সও কম ছিল, অভিজ্ঞতাও কম। এরপর তো স্বাধীন বাংলার শিল্পীরা দেখলেন যে ভারতের সব জায়গায় আমার নাম ছড়াচ্ছে। উল্টোরথ, আনন্দবাজারে আমাকে নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। তখন তাঁরা ডেকে পাঠালেন। গেলাম। তাঁরা বললেন, ‘তুমি এখানে যুদ্ধ করতে এসেছো, ভারতীয়দের কাজ করতে আসোনি। গান রেকর্ড কর। ’ এভাবেই স্বাধীন বাংলায় যোগ দিলাম। সেখানে আমার রেকর্ডে গান হয়েছে—‘জন্মভূমি বাংলা মাগো/একটি কথা সুধাই তোমারে। ’ তারপর, ‘ওই চেয়ে দেখ পুব আকাশ/ফিকে হলো, ভোর হলো, ভোর হলো/পথের আঁধার আর নাই। ’ আরকটি হলো—‘আমরা গেরিলা, আমরা গেরিলা/মুজিবর, মুজিবর, মুজিবর’। আরো কয়েকটা গান ছিল, এই মুহূর্তে ভুলে গেছি।
অনেকেই তো আপনার কাছে গান শিখেছেন।
জীবনভরই আমি ছাত্র তৈরি করেছি (হাসি)। ১৯৬৮ সাল থেকে আলাউদ্দিন আলী থেকে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, এভাবে এখানে-ওখানে প্রায় এক হাজার ছাত্রছাত্রী তো হবেই। তাদের মধ্যে অনেকে হয়তো ভালো গায়ক বা প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হতে পারেনি। নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী আমার ছাত্র নয়, কিন্তু সে আমার গান গেয়েছে। তবে সে সিরিয়াসলি গাইতে পারেনি। ‘আজ এই বৃষ্টি’—গানটির রেকর্ডিংয়ের সময় তাকে গানটি উঠিয়ে দিতে তার বাসায় গেলাম। সে আমার সঙ্গে আলাপ করতে করতে ভারতের কয়েকজন শিল্পীর বিপক্ষে বলা শুরু করল। ওই যে ওই গানটি যে গেয়েছিলেন, ভজন শিল্পী (এই বলে তিনি গাইতে শুরু করলেন)—জিমি রে জিমি, ক্যায়া নাম ন্যায়, তাঁর নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না, যাই হোক, এমন দুয়েকজন গায়কের বিপক্ষে সে বলছিল। সে বলছিল, ‘আমি যদি বোম্বে থাকতাম ওরা কি আমার কাছে পাত্তা পেত?’ তখন নিয়াজকে বললাম, তুমি আমার এই গান এখনই আমার সামনে বসে ওঠাও। আমি তোমাকে গলার এক-দুই লাইনের যে কাজ দেব, তুমি ১০-১২ ঘণ্টায়ও ওঠাতে পারবে না। এখানে হারমোনিয়াম নিয়ে বসো। তখন আর বসে না। তাকে অনুরোধ করলাম, দেখো নিয়াজ, এটি তোমার গান, তোমার জন্য লেখা, লেখাটাও ভালো। তুমি গানটা সিরিয়াসলি গাওয়ার চেষ্টা করো। গলার যে কাজ আছে, তা তুমি সিরিয়াসলি করবে, সেটি আমি পরে শুনব। যা গ্রহণ করার করব, যেটি করব না, ফেলে দেব। আমি কিন্তু আজেবাজে কোনো কাজ গ্রহণ করব না। তোমার প্রতি আমার একটাই অনুরোধ, গানটি তুমি একটু সিরিয়াসলি গলায় উঠিয়ে নাও। তারপর তো সে টিভি স্টেশনে গেল। তখন ওর হাবভাব অন্য রকম। তখন হ্যাপিও (আখন্দ) ছিল। ‘আজ এই বৃষ্টির সাথে’ গানটি গাইতে শুরু করল—‘বেদনাকে সাথি করে, পাখা মেলে দিয়েছ তুমি…কিন্তু ও করছে কী—বেদনাকে সাথি করে পাখা মেলে দিয়েছ তুমিই ই ই ই ই ই’—এভাবে অতিরিক্ত টান দিচ্ছে। বললাম, এগুলো দিয়ো না, এগুলো আমি পছন্দ করি না। আমি জানি, এই টান কেউ-ই পছন্দ করে না। এগুলো এক্সেস। তার চেয়ে গানের কথাটিকে বেশি মূল্য দাও—এই বলে তিনি গাইতে শুরু করলেন—‘বেদনাকে সাথি করে পাখা মেলে দিয়েছ তুমি-ই, ই, ই। ’ এই ধাক্কার সঙ্গে তবলার বোল থাকবে। এভাবে আসবে—‘কোন দূরে যাবে বলো/তোমার পথের সাথি হবো আমি-ই’—এই ধাক্কাটিই সে দিতে পারে না। বললাম না, তুমি এগুলো ঠিক করো, তা না হলে আজ রেকর্ডিংই করব না। এটি অডিওর গান ছিল। স্টুডিওতে বললাম, আপনারা আপাতত রেকর্ডিং অফ করে দেন। তাদের চা খাওয়ার জন্য টাকা দিলাম। বলে দিলাম, যতক্ষণ গানটি ঠিক না হয়, ততক্ষণ রেকর্ডিং বন্ধ রাখবেন। তারপর একটা কাজে স্টুডিওর বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। শুনছি, ও গাইতে চেষ্টা করছে, ‘বেদনাকে সাথি করে তোমার পথের সাথি হবো আমি…ই, ই, ই। ’ আমি কিছুই বললাম না। স্টুডিওর আর্টিস্টরাই তখন তাকে বলছে—‘দাদা, এভাবে নয়, শেষে ধাক্কাটি দিন। ’ অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও নিয়াজ পারল না। শেষমেশ স্টুডিওতে এলাম। তখন খুব রাগ উঠে গেছে। গানটি তার। মেহেদী হাসান হলে কত যত্ন নিয়ে গানটি গাইতেন। সে মেহেদী হাসানের হাঁটার স্টাইল নকল করে, কেউ সালাম করলে তাঁর মতো করে ‘বেঁচে রহো (বেঁচে থাকো)’ বলে, কিন্তু গান গাওয়া অনুসরণ করে না। ভাবছি, গানটি বাতিল করে দেব নাকি? আমাকে দেখে সে বলল, ‘ওস্তাদ…। ’ আমি বললাম, উর্দুতে নয়, বাংলায় বলো। তখন সে দুঃখ প্রকাশ করল, ‘স্যরি। পরে আমি ঠিক করে গাইব। ’ হ্যাপিও বলল, ‘ভাইয়া, প্লিজ মাফ করে দাও। ’ মিউজিশিয়ানরাও বলল। এরপর রেকর্ডিং করলাম। তবে তাকে বলেছি, নিয়াজ, এই গানটি তোমার জীবনে একটি ভালো উপহার ছিল। সুন্দরভাবে গাইলেই পারতে। আরো এক-দেড় ঘণ্টা রিহার্সাল করলে গানটি ভালোভাবে বেরিয়ে আসতে পারত। সবাই গান শুনে খুশি হতেন।
আপনার সুর করা কুমার বিশ্বজিতের যেখানে ‘সীমান্ত তোমার’ গানটি তো প্রথম শেখ ইশতিয়াক গেয়েছিলেন।  
হ্যাঁ, এটি প্রথমে বিশ্বজিৎ তারপর শেখ ইশতিয়াক গেয়েছে। ইশতিয়াককেই আমি বেশি ভালোবাসতাম। তার অনেক গুণ ছিল, কিন্তু ইশতিয়াক আমার কথা শোনেনি। সেও কিশোর কুমারের স্টাইলে গান করত। তাকে বলেছিলাম, ইশতিয়াক, তুমি অন্যকে নকল করা বাদ দাও। তবে যাঁরা কিছুটা গুণী, তাঁরা আবার নিজেদের আরো বেশি গুণী মনে করেন। তার পরও ইশতিয়াকের ব্যাপারে আমার দুর্বলতা ছিল। কারণ তার মা আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, ‘ইশতিয়াকের বাবা আসামে খুব ভালো গান করতেন। তুমি ওর প্রতি একটু খেয়াল রেখো। ’ তাকে বলেছিলাম, ঠিক আছে খালাম্মা, সে যদি আমার কথা শোনে, তাহলে অবশ্যই তার প্রতি খেয়াল রাখব, কিন্তু সে তো কথা শোনেনি। আমার সঙ্গে থেকে তার ‘পলাতক সময়ের হাত ধরে’—গানের মতো গান হলো। ‘নীল মনিহার’—এ ইশতিয়াক গিটার বাজিয়েছিল। সে আমার খুব পছন্দের শিল্পী ছিল। সে তো আমার ছাত্র ছিল। ও খুব ট্যালেন্ট ছিল। অনেক গুণ ছিল। আমিও তাকে এদিক-সেদিক গাইয়ে, বাজিয়ে আরো ব্যাপকতা দিয়েছি। তবে সে একটি ব্যাপার কখনো বদলাতে পারেনি—ওই যে কিশোর কুমারের মতো ‘হে হে, হে’ করা। এসব নিয়ে তার ওপর খুব বিরক্ত ছিলাম। শিক্ষকের কথা না শুনলে তো রাগ করাই স্বাভাবিক। এরপর বিশ্বজিৎ একদিন এসে বলল, ‘বস, প্লিজ, এই গানটি আমাকে দিন, আমি গাইতে পারব। ’ বললাম, এটি তোমার গান নয়। এটি আমার গাওয়ার মতো গান। এটি যে কেউ গাইতে পারবে না, সে একেবারে হাতে-পায়ে ধরল। বলল, ‘না বস, আমি একবার গাইব। ’ তখন রাজি হয়ে গেলাম। বললাম, গানটি কিশোর কুমারের স্টাইলে নয়, নিজের মতো করে গাইবে। যদি তাঁর মতো করে গাও, তাহলে তোমাকে জীবনেও গানটি দেব না। তোমার স্টাইলও তো এখনো বদলায়নি। বহু আগেই তো তোমাকে বলছিলাম যে তুমি কুমার বিশ্বজিৎ হও। কিশোর কুমার হয়ো না। তাঁর মতো গাইলে না হবে কিশোর কুমার, না হবে কুমার বিশ্বজিৎ। তখন সে বলল, ‘ঠিক আছে, আমি চেষ্টা করে দেখি। ’ আমি তাকে সাবধান করে দিয়েছিলাম, এই গানে আমার গাওয়ার স্টাইল ছাড়া কিশোর কুমারের গন্ধ একটুও যদি পাই, তাহলে মিউজিক বাতিল করে নিজেই গাইব। সে শওকত আলী ইমনদের নিয়ে এলো। আমরা একসঙ্গে গান করলাম, কিন্তু সে পারেনি। কিন্তু যেখানে সীমান্ত তোমার—এখানে যে ধাক্কাটি আছে, সেটি সে দেয় না। সে কথা শুনতে চায় না, গোঁয়ার্তুমি করে। যেখানে সীমান্ত শোনার জন্য প্রেমিকা তো অপেক্ষা করে না। মিউজিক যেভাবে আসে সেভাবে তো তার হৃদয়ের মধ্যে ঢুকে যেতে হবে। তারপর সে আমার মতো করেই গাইল। ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’ গানটি ছয় থেকে সাতবার রেকর্ড করে দিয়েছি। আমিই প্রথম এই গানটির মিউজিক করেছি। তবে সেটি সে মার্কেটে দেয়নি। নিজে রেকর্ড করে মার্কেটে দিয়েছে। তবে ফ্লেবারটি আমার তৈরি। কিশোর কুমার থেকে লাকী আখন্দেক ফলো করতে গিয়ে তার স্টাইল চেঞ্জ হয়ে গেল। সে কুমার বিশ্বজিৎ হয়ে গেল।
জেমস কি ‘লিখতে পারি না কোনো গান আজ তুমি ছাড়া’—এই গানটি আপনার সুরে, আপনার মনমতো গাইতে পেরেছেন?   
এই গানের ‘লিখতে পারি না আজ কোনো গান তুমি ছাড়া’—এই বাক্য দুটি আমার লেখা। লাইন দুটি স্কুলে থাকতে লিখেছিলাম, গানের গীতিকার গোলাম মোর্শেদ। গানটি কিন্তু খুব সুন্দর। এবার আমি আবার গানটি রেকর্ডিং করব। কপিরাইট পেয়ে গেলে জেমসকে দিয়েও আবার গাওয়াব। এই গানের জন্য জেমসকে দোষ দিই না। কারণ সে প্রথমেই বলেছে, ‘বস, আমি যতটুকু পেরেছি, ততটুকুই গেয়েছি। এর বেশি পারিনি। ’ তখন বলেছিলাম, তুমি যতটুকু পেরেছ, সেভাবেই গেয়েছ—এটি যে স্বীকার করেছ, তাতেই আমি খুশি। গোলাম মোর্শেদই গানটি স্পন্সর করেছিল। জেমসের যেহেতু বাণিজ্যিকভাবে ভালো গায়ক হিসেবে একটু সুনাম আছে, সেই খ্যাতিই ব্যবহার করা হয়েছে। ইশ! এই গানটিও যে কী সুন্দর! ‘কী করে বললে তুমি তোমাকে হঠাৎ করে ভুলে যেতে। ’ এই গানেও আলাদা জোশ চলে আসে। এটি আইয়ুব বাচ্চু গেয়েছে। ব্যান্ডের অ্যাকসিলেন্ট একটি গান। তবে যাদের তারকা বানিয়েছি, তাদের মধ্যে সামিনা (চৌধুরী) একবার আমাকে দেখতে এসেছিল। যদিও রুনা (লায়লা) আপার সঙ্গে গানের কোনো সম্পর্ক হয়নি, তার পরও তিনি এসেছিলেন।
নিজে এত ভালো গায়ক হয়েও অন্যদের দিয়ে কেন গান করিয়েছেন?
কারণ অনেকে আমাকে দেখলে একটু বিরক্ত হয়। বিশেষ করে স্টেজে দেখলে ভয় পায়—যদি ভালো গাই—এ কারণে আলোর নিচে আসতে চাই না। একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কনসার্টে ভালো গেয়ে ফেলেছিলাম। সে জন্য মাকসুদ পাঁচ বছর আমার সঙ্গে কথা বলেনি। তা ছাড়া আমি একজন মিউজিক ডিরেক্টর। আমাকে সংগীত পরিচালক হিসেবেই আল্লাহ পছন্দ করেছেন। অনেকেই ভালো সুর করতে পারেন না, আধুনিক সুর বসাতে পারেন না—সেগুলো আমি পারি। অনেকে আমার কাছে এসে গাইতে চেয়েছেন, গানগুলো নিজে না করে তাঁদের দিয়ে দিয়েছি। কখনো টাকা ছিল না বলে রেকর্ড করতে পারিনি। ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ গানটি করতে অনেক টাকার স্টুডিও খরচ দিতে হতো। সে টাকা আমার ছিল না। ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে’ সুপারহিট গান, এই গানের জন্য আমি ৫০০ টাকা ফি পেয়েছি। এখন তো অনেক টাকা পাওয়া যায়, তখন তো কিছুই পাওয়া যেত না। টিভি, রেডিও খুব কম টাকা দিত, আর্টিস্টের সংখ্যাও বেশি ছিল। ক্যাসেট কম্পানিগুলো সে সুযোগ নিত। ১২টি গানের জন্য যেখানে ছয় শিফট লাগত, ওরা বলত—এক শিফটে যদি রেকর্ডিং করে দিতে পারেন, দেন, না হলে দরকার নেই। আমার অ্যালবাম কম হওয়ার কারণ হলো—সাউন্ডটেক, সংগীতা, রেডিও টিভি—এরা তো গান বোঝে না। সব জায়গায় দুর্নীতি ঢুকে গেছে। তখন সলো অ্যালবাম ছিল না। ‘ঢাকা রেকর্ড’ অ্যালবাম বের করত। এর মালিক সালাউদ্দিন সাহেব পল্লীগীতি, রূপবান, পতালপুরীর রাজকন্যা—এসব সিনেমার অ্যালবাম করতেন।
এই গানটি তো আপনার বন্ধু কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা?
আমি তো তাঁর মতো ভালো মানুষ দেখিনি। তিনি সব দিকে গুণী, খুব সুন্দর মানুষ। ১৯৭২ সাল থেকে আমাদের পরিচয়। তখন আমার বয়স ১৯ কি ২০ বছর। আমার ‘নীল মনিহার’ গানের গীতিকার এস এম হেদায়েতের সঙ্গে এক বিকেলে শাহবাগে যাচ্ছি, হঠাৎ হেদায়েত কাওসারের দিকে এগিয়ে গেল, ‘কি দোস্ত, কেমন আছো?’ তিনি বললেন, ‘ভালো। ’ হেদায়েত একটু সরল ছিল। তখন সে বলল, ‘এসো তোমাকে একজন গুণীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। ’ আমাকে দেখিয়ে বলল, ‘হি ইজ দ্য গ্রেট লাকী আখন্দ্। হি ইজ অ্যা মিউজিক ডিরেক্টর। ’ হেদায়েত এভাবেই কথা বলত। আমি তাঁকে প্রথমেই বলেছিলাম, আপনি তো দেখি সাংঘাতিক হ্যান্ডসাম। অনেকক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তিনি দেখতে এত বেশি সুন্দর ছিলেন যে মেয়েরা রাস্তায় তাঁকে দেখলেই তাকিয়ে থাকত। যৌবনে তিনি ফিদেল কাস্ত্রো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ছিলেন। তারপর আরো আলাপ হলো। একসঙ্গে গান করা শুরু হলো। তখন মনে হলো, এই লোকটিকেই তো এত দিন ধরে আমি খুঁজছি। কখনো কোনো সুর পেলে হেদায়েতকে বললেই সে সঙ্গে সঙ্গে কথা বসিয়ে দিত। প্রায়ই সেগুলোর কোনো অর্থ থাকত না। আর কাউসারকে দিলে তিনি বলতেন, ১০ মিনিট পর দিচ্ছি। তারপর তিনি যে কথা দিতেন, আমি তো অবাক হয়ে যেতাম, এই সুরের সঙ্গে যে কথা আমি মনে মনে চাইছিলাম, একেবারে হুবহু তিনি সেভাবেই কথা বসিয়েছেন। তিনি যে আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভা, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ফলে আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। কোনো দিন শাহবাগ, কোনো দিন আজিমপুর বা চারুকলার ভেতরে আমরা আড্ডা দিতাম। তিনি চারুকলায় পড়তেন। তবে বেশির ভাগ সময়ই বাসায় বসে আমরা গানে সুর দেওয়ার কাজ করেছি। তখন তো রেডিও, টিভি, স্টেজ—সব জায়গাতেই গানের অবস্থা খুব খারাপ ছিল। টাকা-পয়সা ছিল না। তার পরও আমরা একসঙ্গে এত কিছু কিভাবে সৃষ্টি করলাম? এখন মনে হয়, আসলে আমরা পাগল ছিলাম। আমরা একসঙ্গে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি গান করেছি। ১০০ থেকে ১৫০টি গান লেখা আছে।
ভালো গায়ক হয়েও আপনার গান কম কেন? নিজের প্রতি অবিচার করেছেন বলে মনে হয়নি?
কারণ মিউজিক অ্যারেঞ্জার হিসেবে আমাকে কঠিন কাজটিই করতে হয়েছে। মিউজিক অ্যারেঞ্জ করা এক ধরনের ব্রেন ওয়ার্ক। আমি মনে করেছি, আমার মস্তিষ্ককে আরো একটু বেশি খাটালে গানটি তো আরো একটু ভালো হবে। তবে গায়ক হিসেবে নিজের প্রতি অবিচার করেছি। আগের মতো হয়তো স্ট্যামিনা পাব না, তবে আমি এখন শক্তি সঞ্চার করব এবং ভালো ভালো গান করার চেষ্টা করব।
ব্যান্ডের প্রচলিত ফরম্যাটের বাইরে গান করেছেন কেন? আপনার গানে স্প্যানিশ সুর-রিদম থাকে।
কারণ মিউজিককে আলাদাভাবে আমি বিশ্বাস করি না। যেমন নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত আলাদা। এতে আমি বিশ্বাস করি না। এভাবে আমি ভাবতে ঘৃণা করি। গান গানই। আমি যেমন রবীন্দ্রসংগীত ভালোবাসি, তেমনি ব্যান্ডের গানও আমার প্রিয়।
শ্রুতলিখন : মাসুদ রানা আশিক

Comments

comments

error: Content is protected !!